বাঁশরীর আয়োজনে প্রযোজনাভিত্তিক কর্মশালা এবং নাট্যনির্দেশনা বিষয়ক বিশেষ কোর্স অনুষ্ঠিত (Bashori Hosted a Production-Oriented Workshop Alongside a Special Course on Theatre Direction)

28 April 2025

বাঁশরীর আয়োজনে প্রযোজনাভিত্তিক কর্মশালা এবং নাট্যনির্দেশনা বিষয়ক বিশেষ কোর্স অনুষ্ঠিত (Bashori Hosted a Production-Oriented Workshop Alongside a Special Course on Theatre Direction)

বাঁশরী- একটি নজরুল চর্চা কেন্দ্র’র উদ্যোগে বাঁশরীর কার্যালয়ে কাজী নজরুল ইসলাম রচিত ধর্মীয় সম্প্রীতিধর্মী “পুতুলের বিয়ে” নাটিকার ওপর একটি প্রযোজনাভিত্তিক কর্মশালা এবং নাট্যনির্দেশনা বিষয়ক বিশেষ কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। বাঁশরীর আয়োজনে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলায় নজরুলের এ নাটক মঞ্চায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এর প্রস্তুতি হিসেবে ১০ দিনব্যাপী প্রযোজনাভিত্তিক ও নির্দেশনা বিষয়ক নাট্যকর্মশালা অনুষ্ঠিত হয় বাঁশরীর কার্যালয়ে। প্রখ্যাত নাট্যনির্দেশক গোলাম সারোয়ার এর তত্ত্বাবধানে এ কর্মশালা সম্পন্ন হয়।


এ কর্মশালা ও বিশেষ কোর্সটি উদ্বোধন করা হয় ১৮ এপ্রিল ২০২৫ শুক্রবারে। প্রযোজনাভিত্তিক কর্মশালা এবং নাট্যনির্দেশনা বিষয়ক এ বিশেষ কোর্সে অংশগ্রহণ করেন দেশের ১৪টি জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত নাটক ও নির্দেশনা নিয়ে কাজে আগ্রহী সম্ভাবনাময় তরুণগণ, যাদের মধ্যে রয়েছে নাট্য নির্দেশনার সাথে যুক্ত নাট্যকর্মী এবং নাট্যকলা ও সাহিত্যে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীসহ সংস্কৃতি অঙ্গনের ১৫জন নারী প্রশিক্ষণার্থী।


বাঁশরী – একটি নজরুল চর্চা কেন্দ্র’র বরেণ্য সংগীতশিল্পীদের কণ্ঠে বাঁশরীর উদ্বোধনী সংগীত “জয় হোক, জয় হোক” পরিবেশনার মধ্য দিয়ে এ নাট্যনির্দেশনা ও প্রযোজনাভিত্তিক কর্মশালার উদ্বোধন ও শুভসূচনা করা হয়। এরপর শিল্পীরা পরিবেশন করেন কাজী নজরুল ইসলামের ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা বহনকারী অনবদ্য সংগীত “মোরা এক বৃন্তে দু’টি কুসুম, হিন্দু-মুসলমান”।


উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাট্য নির্দেশক গোলাম সারোয়ার শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি তাঁর বক্তব্যের শুরুতে এ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীসহ সকলকে স্বাগত জানান এবং এ কর্মশালার উদ্দেশ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সকলের সামনে তুলে ধরেন। “পুতুলের বিয়ে” শিশুতোষ নাটকটি প্রযোজনাভিত্তিক এ নাট্যকর্মশালার প্রশিক্ষণের জন্য বাছাই করার ক্ষেত্রে তিনি বলেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত থাকলেও নাট্যকার হিসেবে তিনি সম্যকরূপে স্বীকৃত নন। সেই প্রেক্ষাপটে কবির রচিত অনন্য শিশুতোষ নাটিকা “পুতুলের বিয়ে”র মাধ্যমে তার নাট্যকার পরিচিতি তুলে ধরার একটি প্রয়াস করছে বাঁশরী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই কোর্স শেষে প্রশিক্ষণার্থীগণ দৃঢ়তার সাথে সংকল্পবদ্ধ হয়ে নাট্যনির্দেশক হিসেবে প্রশিক্ষণের সনদ গ্রহণ করবেন। কর্মশালা শেষে প্রশিক্ষণার্থীগণ নিজ নিজ জেলায় গিয়ে কর্মশালা থেকে অর্জিত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও স্বীয় সৃষ্টিশীলতা কাজে লাগিয়ে “পুতুলের বিয়ে” শিশুতোষ নাটিকার নির্দেশনা ও মঞ্চায়নের মাধ্যমে নাটিকাটির অন্তর্নিহিত সম্প্রীতি ও সাম্যের জোরালো বার্তা পৌঁছে দেবেন, এমন প্রত্যাশাও তিনি ব্যক্ত করেন। এরপর প্রশিক্ষণার্থীগণ তাদের পরিচিতি ও অনুভূতি সহভাগিতা করেন।


কর্মশালা উদ্বোধনের পরদিন থেকে পুরোদমে শুরু হয় “পুতুলের বিয়ে” নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে অনুশীলন ও প্রযোজনাভিত্তিক কর্মশালা ও নাট্যনির্দেশনা কোর্সের প্রশিক্ষণ। কর্মশালায় বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাট্যজন ও শিক্ষকবৃন্দ প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। এতে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন ড. ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়, ড. আইরিন পারভীন লোপা, অভিনেতা এ কে আজাদ সেতু, নৃত্যে সান্ত্বনা সাদিকা, সংগীতে গৌরী নন্দী, ডিজাইনার নির্দেশক জুনায়েদ ইউসুফ।


শুরুতেই স্বরসাধনা ও সংগীত বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা প্রদান করেন বাঁশরীর নন্দিত শিল্পী গৌরী নন্দী। কল্পনাশক্তি ধারণ করে আঙ্গিক অভিনয়কে উপস্থাপন করার কৌশল এবং একজন নির্দেশকের অভিনয়শিল্পীকে পরিপূর্ণভাবে তার মঞ্চের কম্পোজিশন, ব্যালেন্স – এ সকল বিষয়ে প্রস্তুত করার প্রারম্ভিক ধারণা প্রদান করেন অভিনেতা একে আজাদ সেতু। বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও এ কোর্সের পরিচালক জনাব গোলাম সারোয়ার একজন নবীন নাট্যনির্দেশক হিসেবে নাটকের কি কি কারিগরী দিক, প্রযোজনা ব্যবস্থাপনা, সাংগঠনিক দিক এবং মঞ্চকৌশল বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে এ নিয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং সচেতন করেন। শিশুদের সাথে নাটকের মাধ্যমে সংযোগ স্থাপন, যেকোনো সমস্যা থেকে যৌক্তিক সমাধানে পৌঁছাতে একটি নতুন চিন্তাশীল থিয়েটারের ধারা হচ্ছে গ্রিপ্স। জার্মান এই গ্রিপ্স এর শৈল্পিক প্রতিবাদের বিষয় অনবদ্যভাবে প্রশিক্ষণার্থীদের মাঝে উপস্থাপন করেন প্রশিক্ষক জুনায়েদ ইউসুফ। প্রশিক্ষক আইরিন পারভীন লোপা প্রশিক্ষণার্থীদের নাটকের অভ্যন্তরীণ গভীরতা, জটিলতা এবং সংকট বিষয়ে আলোকপাত করেন। এরপর চলে দলগতভাবে কণ্ঠ অনুশীলন এবং নাটক পাঠ। বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব এবং লেখক ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশিক্ষণার্থীদের শুদ্ধ উচ্চারণ, ভয়েস মডুলেশন, সংলাপের স্পষ্টতা ও গভীরতা এবং প্রক্ষেপণ বিষয়ে ধারণা প্রদান করেন। পাশাপাশি তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের তাৎক্ষণিক অভিনয়ের কৌশল ও ইম্প্রোভাইজেশন পরিবেশনা উপভোগ করেন। নৃত্য প্রশিক্ষক সান্ত্বনা সাদিকার কাছ থেকে প্রশিক্ষণার্থীগণ নাচের তাল, লয়, ছন্দ, নাচের মুদ্রা, মুভমেন্ট ও টাইমিং বিষয়ে ব্যবহারিক ও তাত্ত্বিক জ্ঞান লাভ করেন। নাটকে শরীর ও মনের স্থিরতা এবং চিন্তাশক্তির প্রয়োজনীয়তা, নাটককে সমৃদ্ধ করার অন্যতম অনুষঙ্গ দৃঢ়তা এবং শিল্পীকে দৃঢ়চিত্ত করে গড়ে তোলার বিষয়ে প্রশিক্ষণার্থীদের সম্যক জ্ঞান দান করেন নাট্যব্যক্তিত্ব গোলাম সারোয়ার। এক্ষেত্রে যোগাসন চর্চাকে সহায়ক বলে তিনি অভিমত দেন।


বাঁশরীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. ইঞ্জিনিয়ার খালেকুজ্জামান প্রশিক্ষণার্থীদেরকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে পুতুলের বিয়ে নাটকের নির্দেশনা ও মঞ্চায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ, শিশুকিশোর ও বড়দের কাছে গিয়ে “মানুষে মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই, সকল মানুষ সমান,” এই গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। তার ভাষ্যে, এই নাটকের মাধ্যমে মূলত আগামী প্রজন্ম অর্থাৎ শিশুদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে কবির শিল্প, সংগ্রাম ও সৃষ্টি। তিনি বলেন, “আমরা বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা জেলা থেকে ৬৪জন নাট্যনির্দেশককে নিয়ে আসবো, তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করবো। তিনি আরও বলেন, “আমাদের জাতি হিসেবে পিছিয়ে থাকা থেকে উত্তরণই আমাদের অন্যতম লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। সর্বোপরি, নজরুল চর্চাকে গতিশীল করাই আমাদের মূল উদ্দেশ্য।” একই সাথে তিনি এই কর্মশালার শুভ উদ্বোধন ঘোষণা করেন। পাশাপাশি, তিনি প্রশিক্ষণার্থীদের সবাইকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে অবস্থিত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধে নিয়ে যাওয়ার ঐকান্তিক ইচ্ছা পোষণ করেন।


এ কর্মশালা ও বিশেষ কোর্সের সমাপনী দিনে প্রশিক্ষণার্থীদের সবাইকে নিয়ে কবির সমাধিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাঁশরীর সভাপতি ড. ইঞ্জিনিয়ার খালেকুজ্জামান, জনাব গোলাম সারোয়ারসহ অন্যান্যরা। এরপর সন্ধ্যায় প্রশিক্ষণার্থীরা বাঁশরীর কার্যালয়ে কর্মশালার সমাপনী দিনে “পুতুলের বিয়ে” নাটক মঞ্চায়ন করে। সবশেষে প্রশিক্ষণার্থীদের সনদ বিতরণের আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে ১০দিন ব্যাপী এ কর্মশালার।

দশদিন-ব্যাপী এ কর্মশালার উল্লেখযোগ্য মুহূর্তগুলো দেখতে এখানে ক্লিক করুন।