নজরুলের “পুতুলের বিয়ে” শিশুতোষ নাটকের প্রযোজনা ও নির্দেশনা ভিত্তিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

27 May 2026

নজরুলের “পুতুলের বিয়ে” শিশুতোষ নাটকের প্রযোজনা ও নির্দেশনা ভিত্তিক কর্মশালা অনুষ্ঠিত

গত ১৭ এপ্রিল থেকে ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ঢাকা, বসিলার নিজস্ব মিলনায়তনে বাঁশরী- একটি নজরুল চর্চা কেন্দ্র (বাঁশরী) আয়োজন করে পুতুলের বিয়ে নাটকের ওপর অভিনয় ও নির্দেশনাভিত্তিক দশদিনব্যাপী কর্মশালা। “পুতুলের বিয়ে” শিশুতোষ নাটকটি ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও ভাষার পার্থক্য উপেক্ষা করে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


নাট্যনির্দেশনা ভিত্তিক এ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন জেলার নাট্যকর্মী। ২০২৫ সালের ১৯ থেকে ২৮ এপ্রিল প্রথমবারের মত ঐ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২৫ সালের সে কর্মশালায় দেশের ১৪টি জেলার ১৫ জন অংশগ্রহণ করেন। এবারের কর্মশালায় ১৪ জেলার ১৬ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করে। দুই কর্মশালারই প্রশিক্ষণার্থীগণ ছিলেন নারী।


কাজী নজরুল ইসলাম রচিত “পুতুলের বিয়ে” শুধু একটি শিশুতোষ নাটকই নয়, এটি মানবতা, সমতা এবং স্পষ্ট উচ্চারণে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে এক অনবদ্য সৃষ্টিকর্ম। ১৯৩৪ সালে নাটকটি রেকর্ড আকারে প্রকাশিত হয়। মানুষে মানুষে সম্প্রীতির পাশাপাশি নারী স্বাধীনতা এই নাটকের উপজীব্য। সেই সাথে এই নাটকে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে স্পষ্ট উচ্চারণে ধ্বনিত হয়েছে। বাঁশরী বিশ্বাস করে, এই নাটকের অন্তর্নিহিত গভীর বার্তা শিশু-কিশোরদের কাছে পৌঁছাতে পারলে তা সুন্দর বাংলাদেশ ও বিশ্ব গড়তে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাঁশরীর উদ্দেশ্য, বাংলাদেশের প্রতি জেলায় কমপক্ষে একজন করে নাট্যনির্দেশক তৈরি করা, যার নেতৃত্বে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ, গ্রামে-গঞ্জে  নাটকটি মঞ্চস্থ হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলে শিশু-কিশোরদের সামনে “পুতুলের বিয়ে” পরিবেশনার মাধ্যমে বাঁশরী নজরুলের ভাবনা শিশু-কিশোরদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চায়, যা তাদের কল্পনাশক্তি, মানবতাবোধ ও সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়তা করবে এবং সমাজের কৃত্রিমতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করবে।


কর্মশালার শেষদিন ২৭ এপ্রিল, বিকেল ৫ টায় অংশগ্রহণকারীগণ নাটকটি বাঁশরীর মিলয়ায়তনে মঞ্চস্থ করেন। কর্মশালা শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের বাঁশরীর পক্ষ থেকে সনদ ও স্মারক উপহার প্রদান করা হয়। এ কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীদের থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতসহ যাবতীয় ব্যয় বহন করে বাঁশরী।

কর্মশালার সার্বিক সমন্বয়ে ছিলেন দেশের খ্যাতনামা নাট্যব্যক্তিত্ব জনাব গোলাম সারওয়ার, যিনি মঞ্চনাটকের শৈল্পিক উৎকর্ষ এবং শিক্ষাদান উভয় ক্ষেত্রেই প্রতিনিয়ত অসামান্য দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। তিনি বলেন, এই কর্মশালার মাধ্যমে যারা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তাঁরা তাদের সাংগঠনিক ও নাট্য নির্মাণের দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজ নিজ জেলায় সফলতার সাথে নির্দেশনা প্রদান করবেন এবং এই নাটকটির সার্থক মঞ্চায়ন করবেন।

 

এ কর্মশালার নির্দেশনার প্রশিক্ষক ছিলেন নাট্যব্যক্তিত্ব জুনায়েদ ইউসুফ ও ড. আইরিন পারভিন লোপা। নির্দেশক আইরিন পারভিন লোপার ভাষ্যমতে, নজরুলের ‘পুতুলের বিয়ে’ নাটকটি শুধু একটি নাট্যকর্ম নয়, এটি ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রায় একশো বছর আগে রচিত হলেও এই নাটক আজও সমান প্রাসঙ্গিক। বর্তমান বাংলাদেশ ও বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নাটকটির মঞ্চায়ন আরও বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, “এই কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে যুক্ত থাকতে পেরে আমি গর্বিত। ১৪টি জেলার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে এই আয়োজন এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা”। তাঁর বিশ্বাস, “বাঁশরীর প্রযোজনায় ‘পুতুলের বিয়ে’ নাটকটি বাংলাদেশজুড়ে দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়ে যাবে এবং নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা সর্বত্র ছড়িয়ে দেবে।” এছাড়া,  উচ্চারণ ও বাচনিক কণ্ঠশীলনে প্রশিক্ষক হিসেবে ছিলেন বাচিকশিল্পী বরকত উল্লাহ, শারিরিক অনুশীলনে অভিনেতা এ কে আজাদ সেতু, সংগীত প্রশিক্ষণে কণ্ঠশিল্পী গৌরী নন্দী, এবং নৃত্য প্রশিক্ষণ ও কোরিওগ্রাফিতে ছিলেন কোরিওগ্রাফার শামসি সায়িকা।



ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বাঁশরীর সভাপতি ড. ইঞ্জিনিয়ার খালেকুজ্জামান বলেন, “আমরা প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে নাট্যদল তৈরি করতে চাই, যারা নিয়মিত নাটকটি মঞ্চস্থ করবেন। আমরা আরও কর্মশালা আয়োজন করব। আমরা বাঁশরী আশা করছি, এই প্রশিক্ষিত নির্দেশকদের তত্ত্বাবধানে ‘পুতুলের বিয়ে’ নাটকটি দেশের বিভিন্ন জেলার বিভিন্ন মঞ্চে এবং স্কুল-কলেজে মঞ্চস্থ হবে। আমরা নজরুল চেতনায় উদ্দীপ্ত মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন সৃজনশীল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছি।”